টপিকঃ আমাদের পথশিশু, আমাদের দেব শিশু
আমাদের সকলেরই তো প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হতে হয়, কাজে-অকাজে। কত মানুষই না চোখে পড়ে পথে চলতে গিয়ে, কেউ হয়ত ব্যস্ত সমস্ত হয়ে রাস্তা পার হচ্ছে, কেউ নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে হয়ত জানা নেই কি করবে, অথবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেয়ালে খবরের কাগজ কেউ পড়ছে নয়ত সিনেমার পোস্টারের দিকে চেয়ে চেয়ে ক্ষনীকের জন্য রূপালী জগতে হারাচ্ছে, অথবা কারো মুখে এমন একটা ভঙ্গি যেন দুনিয়া উলটে গেলেও কিছু আসে যায়না। আর আমি যা করি তা হল, রাস্তায় বের হলে মানুষ দেখি, হরেক রকম মানুষ। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, আমিও। ঘড়ির কাটার সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছি আমরা সবাই, প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের মহামূল্যবান, কারোর দিকে তাকানোর সময় নেই, ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত পথের মাঝে আরও কিছু মানুষ(!) আছে তারা কিন্তু ব্যস্ত নয়, ফুটপাতে বা রাস্তার মাঝে বসে তারা আড্ডা দিচ্ছে নিজেদের মাঝে কথোপকথোনে মেতে আছে, আমাদের কাছে ওদের একটা বিশেষ পরিচয় আছে, আছি একটা বিশেষ নামও। পরিচয়: ওরা পথশিশু, নাম: টোকাই..........
বাংলাদেশে সরকারের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী(বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ) পথশিশুদের সংখ্যা প্রায় ৩,৮০,০০০ পুরো বাংলাদেশ জুড়ে, এদের ৫৫ ভাগেরই বসবাস ঢাকা শহরে। এর মাঝে ৪৯.২% এর বয়স ১০ এর নিচে। আর বাকিরা ১১-১৯ এর কাতারে পড়ে। যদি ছেলে মেয়ে আলাদাভাবে এই শিশুদের বিবেচনা করা হয় তবে দেখা যাবে যে, ছেলেশিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৪.৩% এবং মেয়ে শিশুর সংখ্যা ২৫.৭%। পরিসংখ্যানে আরো একটা আশংকা করা হয়েছে যে যদি সংখ্যাটা এভাবে বাড়তে থাকে তবে ২০১৪ সাল নাগাদ তা ৯,৩০,০০০ এ গিয়ে দাঁড়াবে। ওই পথশিশুদের কাতারে নিজের ভাই, সন্তানকে ফেলুন!!! একবার ভেবে দেখুন তো আপনার সন্তান বা ভাই/বোনেরা যে বয়সে স্কুলে যায় সেই বয়সের ওরা কি করে?? কেন করে?? আপনার সন্তান বড় হয়ে জজ-ব্যরিস্টার, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে, ওদের ভবিষ্যত নিশ্চত, মাথার উপরে ছাদ আছে আছে বাবা-মায়ের আদর-স্নেহ। আমাদের সন্তান সকাল বেলা কি খাবে, কি পড়বে এ নিয়ে কোন অনিশ্চয়তা ভুগি না, কিন্তু ওদেরই সমবয়সী পথশিশুরা রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে এটা-ওটা ফেরী করে, কখনোবা আমাদের হাতে মারও খায়, আমি নিজেই দেখেছি রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে থাকা ট্রাফিকের হাতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই বড় হচ্ছে ওরা, বড় হয়ে যদি ওরা শীর্ষ সন্ত্রাসী হয় তাহলে সেই দায়ভারটা কার? সঠিক সময়ে লেখাপড়ার অভাবে এরা অনেকেই বিভিন্নমুলক অপরাধমুলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে তার দায়ভার কি শুধু আমাদের সরকারের ওপর দিয়েই খালাস হয়ে যাব। এদের অনেকেই পলিথিনের মাধ্যমে এক ধরনের মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়েছে। আমি নিজেই দেখেছি, তখন বুঝিনি, পত্রিকায় পড়ে জানতে পেরেছি কি সর্বনাশা পরিণাম হতে পারে সেটা গ্রহনের ফলে।
দিনের বেলায় না হয় ওরা কোনমতে কাটিয়ে দিল কিন্তু রাতে?? যেখানে নিজগৃহেই আপনার-আমার কন্য সন্তান নিরাপদ নয় সেখানে ২৫.৭ % মেয়ে শিশু যারা রাস্তায় থাকে বা থাকতে বাধ্য হয় এদের কথা ভাবতে গেলে সত্যিকার অর্থেই ভয়ে শিউরে উঠতে হয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের ছাত্রীরাও যেখানে যৌন হয়রানির শিকার হয় সেখানে ওই পথ শিশুদের অবস্থা কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন?? একসময়ে ওরাই পতিতা হতে বাধ্য হবে বা বাধ্য করা হবে, সমাজের সবাই দিনের আলোয় ওদের দিকে থু থু ছিটাবরে আর রাতের আধারে ওদের সাথেই কিছু সময় কাটিয়ে হাতে টাকা গুজে দিয়ে আসবে!!! ধর্মী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন অনুষ্ঠানেই ওদের ঠাই নেই, রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরের চেয়েও অনিশ্চিত ওদের জীবন, সব দোষ কি সরাকারের?? ওর বিন্দুমাত্র দায়ভার কি আপনার, আমার ওপর বর্তায় না???
ডঃ নিয়াজ আহমেদ খানের একটি প্রবন্ধ থেকে উপরোক্ত পরিসংখ্যান গুলো নেয়া হয়েছে।। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের একজন প্রফেসর।